শ্যামনগর(সাতক্ষীরা) প্রতিনিধিঃ বৈশাখের খরতাপে পুড়ছে বাংলাদেশের সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকা। বৃষ্টির দেখা নাই ,তাপদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত। কালবৈশাখীর সময় চললেও তারও দেখা মেলেনি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কি এমনটা ঘটছে? নাকি প্রকৃতির প্রতি মানুষের নিষ্ঠুর আচরণের এটি প্রাকৃতিক প্রতিশোধ?

সামনে অপেক্ষা করছে আম-কাঁঠাল পাকানো ভরা মধুমাস। এ সময়ে কেমন হবে আবহাওয়া এ নিয়ে নানান আলোচনা মানুষের মাঝে। অসহ্য গরমে গাছগাছালির পাতা যেন নড়ছে না, ঘরের আসবাবপত্র থেকে শুরু করে সকল জিনিসপত্র গরমে যেন তেঁতে উঠছে। বাতাসে আদ্রতা কম থাকায় ফ্যানের বাতাসও গরম হয়ে উঠছে। এমন মন্তব্যই করছেন লকডাউনে বাড়ীতে বসবাসকারীরা।

অনাবৃষ্টির কারণে খরা দেখা দিয়েছে,কৃষকের দুশ্চিন্তা বাড়ছে

গত কয়েক মাসে কোন বৃষ্টিপাত নাই ফলে বৃষ্টিপাতের রেকর্ডও নাই। এ অবস্থায় বৃষ্টি নির্ভর ফসল চাষিদের মাথায় হাত উঠেছে। উপকূলের শ্যামনগর লবনাক্ত এলাকা হিসাবে পরিচিত। কৃষি ফসলের ক্ষেত, লবন পানির চিংড়ি ঘের , পুকুর বা জলাশয়ে সর্বত্র অন্যান্য মৌসুমের তুলনায় লবনাক্ততার মাত্রা বেড়ে গেছে। এদিকে প্রচন্ড খরায় শ্যামনগর উপজেলার ধূমঘাট , কৈখালী ,মুন্সিগঞ্জ সহ অন্যান্য এলাকার রসালো ফল তরমুজ মুটিয়ে ছোট হয়ে গেছে। তরমুজের সাইজ ও ওজনও কমে গেছে।

শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ গ্রামের আম চাষি পরিমল রায় বলেন, প্রচন্ড খরায় আমের গুটি শুকিয়ে পড়ে যাচ্ছে। জেলেখালী গ্রামের বাসিন্দা নিরঞ্জন মন্ডল বলেন, তার লিচু গাছের লিচু শুকিয়ে পড়ে যাচ্ছে। আবহাওয়া অতিরিক্ত গরম থাকায় ক্ষেতের শাকসবজি লাল শাক, ঢেঁড়স,মিষ্টি কুমড়া অন্যান্য ফসলও শুকিয়ে যাচ্ছে। এই সমস্যা নিয়ে আমরা গভীর চিন্তায় আছি।  

শ্যামনগর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ এস এম এনামুল ইসলাম বলেন, পানি সংকটের কারণে তরমুজের সাইজ ছোট হচ্ছে, বাঁকা হচ্ছে। আবার কোথাও পোকার আক্রমণ দেখা যাচ্ছে। বৃষ্টির পানিতে ভিটামিন বিশেষ করে নাইট্রোজেন থাকে। ফলে অনাবৃষ্টির কারণে এ জাতীয় সঙ্কট দেখা দিয়েছে।  একারণে এবার তরমুজের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন না হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।

তবে শ্যামনগরে দিনে দিনে বোরো ধান চাষের আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর এর উপরে জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মোঃ জিয়াউল হক বলেন, সব ফসলের জন্য বৃষ্টি প্রয়োজন । কিন্ত এবার শীতের পর থেকে বলা যায় বৃষ্টির দেখা নেই। ফলে বোরো ধানের কাঙ্ক্ষিত ফলন নিয়েও কিছুটা শঙ্কা আছে।

তাপপ্রবাহ ও লবনাক্তায় উপকুলের মৎস্য সম্পদ হুমকির মুখে

শ্যামনগর সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার তুষার মজুমদার জানিয়েছেন, তাপদাহের কারণে উপজেলায় শতকরা ৮০ ভাগ চিংড়ি ঘেরের মাছ মারা যাচ্ছে। চিংড়ি সর্বোচ্চ ৩৫ ডিগ্রী পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে কিন্ত বর্তমানে তার বেশী তাপমাত্রা পড়ায় ঘেরের মাছ মারা যাচ্ছে।  একই সাথে পানির পিপিটিও বেড়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। চিংড়ি ঘেরগুলোতে পানি কম থাকায় আবার তাপমাত্রা বেশী হওয়ায় মাছ মরে যাচ্ছে। বর্তমানে লবণ পানির মাছের ঘেরে লবনাক্ততা সর্বোচ্চ ২৫ পিপিটি পাওয়া গেছে।

ঔষধী গুণ সম্পন্ন সুন্দরবনের মধু ঐতিহ্য হারাতে যাচ্ছে

উপকুলের সুন্দরবন সংলগ্ন দাতিনাখালি গ্রামের মৌয়াল আজগর আলি, আব্দুল হালিম বলেন, বৃষ্টি হলে মধু বেশি পাওয়া যায়। প্রচন্ড খরায় মধু শুকিয়ে গেছে। গাবুরা এলাকার মৌয়াল আবুল কাশেম, মুন্সিগঞ্জ গ্রামের মৌয়াল সিরাজুল ইসলাম বলেন গাছে মধু থাকলেও অন্যান্য বার এক একটি চাকে মধু বেশী পাওয়া যেত কিন্ত এবার বৃষ্টি নাই ফলে মধুর চাকে মধু কম পাওয়া যাচ্ছে।

বন গবেষক ঋজু আজম বলেন বৃষ্টির সাথে মধু উৎপাদনের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বৃষ্টি কম হলে গাছে ফুল কম হয় আর  ফুল কম হলে মধুর প্রাপ্তিও কম হয়।

দক্ষিণ-পশ্চিম উপকুলে খাওয়ার পানির সংকট বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে রোগ

 দক্ষিণ পশ্চিম উপকুলীয় এলাকা শ্যামনগরে খরায় চলছে সুপেয় পানির সংকট। লবনাক্ত এলাকা হিসাবে বিভিন্ন এলাকায় সারা বছর কমবেশী সুপেয় পানির সংকট থাকে। কিন্ত শুষ্ক মৌসুমে এই সংকট তীব্র আকার ধারণ করে থাকে। বর্তমানে উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ, ঈশ্বরীপুর, রমজাননগর, কাশিমাড়ী, পদ্মপুকুর,কৈখালী ইউনিয়ন’সহ অন্যান্য এলাকায় পানির জন্য পিএসএফ বা অন্যান্য উৎস থেকে নারীরা লাইন দিয়ে কলস নিয়ে পানি সংগ্রহ করছেন। সম্প্রতি উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউপির দূর্গাবাটি সাইক্লোন শেল্টার সংলগ্ন পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়ী বাঁধ ভেঙ্গে যেয়ে খোলপেটুয়া নদীর লবন পানিতে এলাকা প্লাবিত হয় । এর ফলে পুকুর বা জলাশয় লবন পানিতে ভরে যাওয়ায় খাওয়ার পানির সংকট দেখা যায়। এদিকে গত ১৮ এপ্রিল ভাঙ্গনকৃত এলাকাবাসীর আয়োজনে খাওয়ার পানির দাবিতে সুন্দরবন সংলগ্ন মুন্সিগঞ্জ প্রধান সড়কে নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণে এক মানববন্ধন করেন।

বৈশাখের তাপদাহে  বিভিন্ন এলাকায় খাল বিল শুকিয়ে ফেটে গেছে। মাঠ ফেটে যাওয়ায় জমিতে ঘাস কম হওয়ায় গবাদিপশুর খাদ্য সংকটও দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় শুকনো মৌসুমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে পুকুর পুনঃখনন কাজ করছেন অনেকে। উপজেলা সদরের বাদঘাটা গ্রামের দিনমজুর শম্ভু মন্ডল, কালাম গাজী বলেন, তারা এক দল শ্রমিক সকালে ও বিকালে কয়েকটি পুকুর পুনঃখনন কাজ করছেন।

শ্যামনগর জলবায়ু বিশেষজ্ঞ লির্ডাসের নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মন্ডল বলেন, বর্তমানে প্রচন্ড খরতাপ চলছে । অত্যাধিক তাপপ্রবাহের কারণে মাটির ময়েশ্চর কমে যাচ্ছে। লবন পানির স্তর ভূগর্ভস্তরের কাছাকাছি চলে আসছে। এর ফলে লবনাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর লবনাক্তা বৃদ্ধির কারণে ফসল মারা যাচ্ছে, ব্যাপকভাবে খাওয়ার পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। তাপপ্রবাহের কারণে বৃদ্ধ মানুষের হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।

দীর্ঘদিন উপকুলীয় এলাকায় নারীদের নিয়ে কাজ করছেন নকশীকাঁথার পরিচালক চন্দ্রিকা ব্যানার্জি। তিনি বলেন, খরার কারণে নারীদের প্রধান সমস্যা খাওয়ার পানি। পরিবারের সকলের কথা চিন্তা করে নিজেকে পানি কম করে পান করতে হয়। তিনি বলেন, গরমের কারণে দেহের চাপা অংশগুলোতে ঘাম জমে খুব সহজে রোগ সংক্রমণ হয়। যেমন দাদ, চুলকানি, ঘামাচি, একজিমা ,ফোঁড়া ইত্যাদি। এ সময় দেখা যাচ্ছে পেটের পীড়া ও নারীদের ইউরিন জনিত সমস্যা।

শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার বিপ্লব কুমার দে বলেন, প্রচন্ড তাপদাহের কারণে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে ডায়রিয়া, পেটেরপীড়া ও চর্মরোগীর সংখ্যা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এছাড়া সকল বয়সের মানুষের সর্দি,কাশি দেখা যাচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে ভর্তিকৃত রোগীর মধ্যে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে বেশিরভাগই ডায়রিয়া আক্রান্ত। উপজেলার দেবীপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি অনিরুদ্ধ কর্মকার সম্পদ বলেন, ক্লিনিকে প্রতিদিন ৪০/৪৫ জন রোগী ডায়রিয়া, সর্দি-কাশি নিয়ে ভর্তি হচ্ছেন।